NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, সোমবার, মে ১১, ২০২৬ | ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
লুৎফুর রহমানের পর নিউহাম কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশি ফরহাদ হোসেন শুভেন্দুকে দেখেই ‘জয় বাংলা’ ও ‘চোর চোর’ স্লোগান, উত্তাল কালীঘাট The Obama Nuclear Deal: A Legacy of Hope and a Challenge for Trump and Netanyahu - Dr. Pamelia Riviere ঐতিহাসিক সিরাকিউস শহরে লায়ন্স ক্লাব ডিস্ট্রিক্ট-২০এ শাহ নেওয়াজ প্রথম ভাইস গভর্নর নির্বাচিত নিউ ইয়র্কে ১৪ এপ্রিল ‘বাংলা নববর্ষ’ ঘোষণার ঐতিহাসিক রেজুলেশন প্রেমের এক বৈশ্বিক মহাকাব্য হুমায়ূন কবীর ঢালীর কাব্যসংকলন ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা’ People-Centered Presence  Where are the connections with the diaspora, Bangladesh’s informal envoys? স্টুডেন্ট ভিসাধারীদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বার্তা Questions in the Diaspora Over Bangladesh’s Representation at the United Nations জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রবাসে প্রশ্ন
Logo
logo

সবার উৎসবে আমরা বাংলাদেশ - নন্দিনী  লুইজা


আকবর হায়দার কিরণ   প্রকাশিত:  ১১ মে, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম

সবার উৎসবে আমরা বাংলাদেশ - নন্দিনী   লুইজা

 বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ—এই মূল্যবোধটি রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ছিল। সেই অঙ্গীকারের সূত্র ধরেই বলা হয়, এখানে বাঙালি জাতিসত্তা ও মানবিক মূল্যবোধই মূল পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় নয়। তাই ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষদের আনন্দ-উৎসব একসঙ্গে ভাগ করে নেওয়া কেবল সামাজিক সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সাংবিধানিক চেতনারও প্রমাণ। বাংলাদেশের জন্মলগ্নে চারটি মূলনীতির মধ্যে অন্যতম ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেক নাগরিক সমান, কেউ ধর্মের কারণে বড় বা ছোট নয়।এই দর্শন থেকেই এসেছে “বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ”-এটা গর্বিত ঘোষণা। সেই সূত্রে, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মের মানুষদের উৎসবে সবার অংশ নেওয়া কেবল আবেগের প্রকাশ নয়, এটি যুক্তিসঙ্গত এবং রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।    বাংলাদেশের ইতিহাসে অসাম্প্রদায়িক চেতনার শিকড় গভীর। লালন, চণ্ডীদাস, শাহ আবদুল করিম, খাজা এনায়েতপুরী থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম—সবাই মানবধর্মকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্থাপন করেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী—সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান“ধর্মনিরপেক্ষতা”কে অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করেছে।  

 সব ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ যখন একে অপরের উৎসবে শামিল হয়, তখন সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও আস্থার বন্ধন মজবুত হয়। দুর্গাপূজার সময় মুসলিম প্রতিবেশীর বাড়িতে প্রসাদ পৌঁছে দেওয়া, ঈদে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান বন্ধুদের দাওয়াতে অংশ নেওয়া কিংবা বড়দিনে একসঙ্গে কেক কাটা-এসব আচরণ সামাজিক সম্প্রীতিকে বাস্তবে রূপ দেয়। সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে উঠলে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়ে, যা সহিংসতা ও বিদ্বেষ কমাতে সহায়ক। সংস্কৃতি উৎসব বিনিময়ের মাধ্যমে গান, নাচ, পোশাক, খাদ্যাভ্যাসের আদান-প্রদান ঘটে, যা জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। পরিবার ও তরুণ প্রজন্মের শিশু ও তরুণরা একে অপরের রীতি-নীতি কাছ থেকে দেখে শেখে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্ত ও মানবিক চিন্তাধারায় গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা হিসেবে পালন করে।    উৎসবগুলো কেবল সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ঈদ,পূজা, বড়দিন,বুদ্ধপূর্ণিমা বা পহেলা  বৈশাখ-সব বড় উৎসবেই বাজারে কেনাকাটার চাহিদা বাড়ে। পোশাকশিল্প, মিষ্টির দোকান, ফুলচাষ, আলোকসজ্জা, পরিবহন-  সবখানেই ব্যবসা জমে ওঠে।শুধু তাই নয় উৎসব কে ঘিরে সব দিকে একটা আনন্দের মেলা বসে। সেটা যে পেশাই হোক না কেন। পেশাভিত্তিক সুযোগ সৃষ্টি হয় শিল্পী, কারিগর, ফটোগ্রাফার,  ইভেন্ট ম্যানেজার পর্যটনকর্মী-বিভিন্ন খাতে অস্থায়ী হলেও কাজের সুযোগ তৈরি হয়।   অর্থনৈতিক প্রভাবে উৎসবের বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। বাজারের উত্তাপ সবার মধ্যে আঁচ লাগে। ঈদের পোশাক, দুর্গাপূজার মণ্ডপ, বড়দিনের কেক, পহেলা বৈশাখের মেলা- সব ক্ষেত্রেই ব্যবসা বাড়ে, অর্থনীতির চাকা সচলতা পায়।  এক্ষেত্রে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিও বিশাল ভূমিকা রাখে।  গরু-ছাগল, মাটির মূর্তি, হাতের কাজ- সবই গ্রামীণ আয় বাড়ায়। ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য  পর্যটন ও সেবা খাত অনেক আগে থেকেই তৎপর হয়। উৎসবকেন্দ্রিক পর্যটন, হোটেল, পরিবহন, আলোকসজ্জা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট খাতে মৌসুমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।  

রাজনৈতিক প্রভাবে অসাম্প্রদায়িকতা কেবল সামাজিক নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে যখন মানুষ একে অপরের উৎসবে অংশ নেয়, তখন তারা জাতিগত বা ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিক হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়। এটি গণতন্ত্রের জন্য শক্ত ভিত তৈরি করে। নীতিনির্ধারণে সরকারকে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বজায় রাখতে সহায়তা করে, কারণ জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা স্পষ্ট থাকে। আন্তর্জাতিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় সহাবস্থানের উদাহরণ বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের আস্থা বাড়ায়। গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রচেতনার শক্ত ভিত তৈরির পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ নাগরিকত্ব বজায়ে রাখে, সবাই একে অপরের উৎসবে অংশ নিলে ধর্মভিত্তিক বিভাজন দুর্বল হয়, গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী হয়।   তবুও চ্যালেঞ্জ অস্বীকার করা যায় না। রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে বিদ্বেষ ছড়ানো, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়া, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর মাঝে মাঝে হামলা- এসব অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য হুমকি।

তবে বাস্তবতায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ঘৃণামূলক বক্তব্য, রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের ব্যবহার-এসব বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জে ফেলে । মাঝে মাঝে দেখা যায়, কোনো উৎসবকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে হামলা হয়, অথবা রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় অনুভূতি উসকে ভোটের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত, এসব ঘটনা সমাজের জন্য অশনি সংকেত।  এগুলো মোকাবিলায় দরকার-শিক্ষায় বহুসাংস্কৃতিক পাঠ্যক্রম ও ইতিহাস চর্চা,   ধর্মীয় বিদ্বেষ রুখতে আইনের কঠোর প্রয়োগ,  গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সচেতন উদ্যোগ।  সবাই মিলে একে অপরের আনন্দ-উৎসব উদ্‌যাপন করা শুধু যুক্তিযুক্ত নয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার মূল আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।    তবে যুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন-শিক্ষা ও সচেতনতায় স্কুল-কলেজে বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া, ইতিহাসে অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনের গল্প তুলে ধরা। আইনের কঠোরতায় ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ালে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।  

মিডিয়ার ভূমিকায় গণমাধ্যমে ইতিবাচক উৎসবের চিত্র প্রচার করে, মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়ানো। সবার উৎসবে সবার অংশগ্রহণ কেবল নৈতিক নয়, বাস্তবিক দিক থেকেও অপরিহার্য। এটি সামাজিক সম্প্রীতি দৃঢ় করে, অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্নে মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছিলেন, তা বাস্তব রূপ পায় তখনই, যখন আমরা একে অপরের আনন্দে শরিক হই।   অতএব, বলা যায়-ধর্মের ভেদরেখা পেরিয়ে সবার উৎসব সবার হয়ে ওঠা শুধু যুক্তিযুক্ত নয়, বাংলাদেশের টেকসই অগ্রগতিরও প্রধান শর্ত।  “সবার উৎসব, সবার বাংলাদেশ”—এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, আমাদের টেকসই অগ্রগতির পথ নির্দেশক।   বাংলাদেশের অস্তিত্বের কেন্দ্রে আছে বাঙালিত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ। তাই এখানে দুর্গাপূজা, ঈদ, বড়দিন বা বৈশাখের আনন্দ—সবই জাতীয় উৎসবের অংশ। সামাজিক সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একে অপরের আনন্দ-উৎসবে অংশ নেওয়া অত্যন্ত যৌক্তিক এবং প্রয়োজনীয়। অসাম্প্রদায়িক চেতনা কেবল স্লোগান নয়, এটি জাতির বেঁচে থাকার শর্ত। যতদিন আমরা সবাই মিলেমিশে, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে থেকে উৎসব পালন করব, ততদিন বাংলাদেশ তার প্রকৃত পরিচয় ধরে রাখতে পারবে-একটি শান্তিপূর্ণ, অগ্রসর এবং মানবিক রাষ্ট্র হবে।