NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, সোমবার, মে ১১, ২০২৬ | ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
লুৎফুর রহমানের পর নিউহাম কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশি ফরহাদ হোসেন শুভেন্দুকে দেখেই ‘জয় বাংলা’ ও ‘চোর চোর’ স্লোগান, উত্তাল কালীঘাট The Obama Nuclear Deal: A Legacy of Hope and a Challenge for Trump and Netanyahu - Dr. Pamelia Riviere ঐতিহাসিক সিরাকিউস শহরে লায়ন্স ক্লাব ডিস্ট্রিক্ট-২০এ শাহ নেওয়াজ প্রথম ভাইস গভর্নর নির্বাচিত নিউ ইয়র্কে ১৪ এপ্রিল ‘বাংলা নববর্ষ’ ঘোষণার ঐতিহাসিক রেজুলেশন প্রেমের এক বৈশ্বিক মহাকাব্য হুমায়ূন কবীর ঢালীর কাব্যসংকলন ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা’ People-Centered Presence  Where are the connections with the diaspora, Bangladesh’s informal envoys? স্টুডেন্ট ভিসাধারীদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বার্তা Questions in the Diaspora Over Bangladesh’s Representation at the United Nations জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রবাসে প্রশ্ন
Logo
logo

বুঁকি, সুঁচ এবং একটি পরিবারের অপূর্ণতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্পূর্ণতা - নন্দিনী লুইজা


আকবর হায়দার কিরণ   প্রকাশিত:  ১১ মে, ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম

বুঁকি, সুঁচ এবং একটি পরিবারের অপূর্ণতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্পূর্ণতা - নন্দিনী লুইজা

  বুঁকি শুধু একটি পোষা বিড়াল নয়, সে আমাদের পরিবারের অস্থির, দুষ্টু এবং অত্যন্ত প্রিয় সদস্য। তার সুঁতা নিয়ে খেলার নেশা আমরা সবাই জানি, তবুও শনিবার দুপুরের ঘটনাটি আমাদের সকলকে এক অস্বাভাবিক যাত্রায় ঠেলে দিল আলাদা ভাবে। শুধু এতটাই আলাদা যে, জীবনের টুকরো টুকরো দুর্বল মুহূর্তগুলো কীভাবে হঠাৎ করেই এক মহীরুহের শিকড়ে পরিণত হতে পারে -তার প্রমাণ হয়ে আছে সময়ের পাতায়। বুঁকি, আমাদের ছোট্ট দুষ্টু বিড়ালটি, তার লোমশ থাবায় ধরছিল না শুধু একটি সুঁচ; ধরেছিল আমাদের পারিবারিক জীবনের সমস্ত অস্থিরতা, সমস্ত অপ্রস্তুতিকে, এক সুঁতোয় গেঁথে।   বিড়ালদের স্বভাব হচ্ছে সুঁতা নিয়ে খেলা। ওরা অনেক সময় সুঁতা বেশ পরিমাণ খেয়ে ফেলে এতে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। এটা মনে হয় যারা বিড়াল পোষে তারা কমবেশি জানেন। কিন্তু আমার জানা ছিল না  সুঁচ গিলে ফেলতে পারে।  আধাঘন্টা আগেই অঙ্গনা কেরালা থেকে বলছিল মা ওরা সুঁতা নিয়ে খেলা করে। সুতা গুলো তুমি সাবধানে একটা প্লাস্টিক বক্সে রেখে দিও। আমি বললাম সেটাই, বাহিরে নাই।   সেদিন ঠিক দুপুরে, কাঁথা সেলাই করতে গিয়ে রান্নাঘরে যাওয়ার ফাঁকে সুঁচ কাপড়ে লাগিয়ে রেখেছি। বুঁকি তার স্বভাবসুলভ দুষ্টুমিতে সুঁচ  আমাদের সামনেই গিলে ফেলল।তখন শুরু হলো এক অপ্রত্যাশিত দুঃস্বপ্ন। এই সুঁচটিই হয়ে দাঁড়াবে আমাদের পরিবারের জন্য এক অদৃশ্য পরীক্ষার সূচনা। বুঁকি যখন তা গিলে ফেলল, তখন শুধু একটি প্রাণীই বিপন্ন হয়নি; বিপন্ন হয়ে পড়েছিল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভঙ্গুর নিশ্চিন্ততা। টেলিফোনের ওপারে দেশের বাইরে থাকা বড় মেয়ের কণ্ঠে শোনা গেল উদ্বেগের তীব্রতা - দূরত্ব যেন সেদিন মাইল নয়, যোজন যোজন বেদনায় পরিণত হয়েছিল। তার বকা আমার কানে প্রবেশ করছিল না, প্রবেশ করছিল এক মায়ের হৃদয়স্পন্দন, যে জানে সন্তানের চিন্তায় কাতর হওয়াটাই তার স্বভাব। ছোট মেয়ের চিৎকার ছিল অব্যক্ত ভয়ের এক মূর্ত প্রকাশ। আর রেজা, যে বিড়ালের দুষ্টুমি পছন্দ করে, ওদের ভালো মন্দ দেখে কিন্তু আতংকে তার মুখে দেখলাম এক গম্ভীর আসফালন। সে যেন একাই পাহাড় হয়ে দাঁড়াল এই অচেনা সঙ্কটের মুখে।   তড়িঘড়ি করে ডাক্তারের পরামর্শ, এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।

এক্সে করা সুঁচ পেটে ডুকে গেছে। দীর্ঘ অপেক্ষা, অস্ত্রোপচার ২.৩০ ঘন্টা। অনেক মানুষ তাদের পোষা প্রাণীর নিরাপত্তার জন্য এখানে এসেছে। করোনার পর মানুষের পশু প্রেম বেড়েছে। তাছাড়া মানুষের প্রতি মানুষের বিস্বাস ভালোবাসা নাই বললেই চলে।আর একা একা ছোট পরিবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে ফলে অবুঝ প্রাণীই অবসরের বিনোদন।   বুঁকির চিন্তায় নিজেরা বাসায় থাকতে না পেরে রেজাই আমাকে নিয়ে হাসপাতালে গেল। দুপুরের খাবার তখনও রান্নাঘরেই অসমাপ্ত, সময় গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। ক্ষুধা, উদ্বেগ, ক্লান্তি সব মিলিয়ে একটা অদৃশ্য চাপ তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এই পুরো সময়ে আমি লক্ষ্য করলাম, আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের মধ্যে লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আমরা প্রায়ই ভাবি, পরিবার মানেই ভালোবাসা, মানেই একতা। কিন্তু সত্যিকার পরিবার তো তখনই, যখন ভালোবাসার নিচে জমে থাকা অস্থিরতা, ভুল বোঝাবুঝি, ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা- সবকিছুর উপরে উঠে আমরা হাতে হাত মিলিয়ে দাঁড়াই। বড় মেয়ে দূর থেকেই যতটা পারে সাহায্য করার চেষ্টা করছিল, ছোট মেয়ের চিৎকারে মিশে ছিল অবিশ্বাস্য মমতা,আর রেজা যে বিড়ালের দুষ্টুমি সহ্য হয় না বলেই জানত, তার মুখে দেখলাম এক ধরনের গম্ভীর দায়িত্ববোধ। আর আমি নিজে ধৈর্য ধরে, একটু একটু করে পরিস্থিতি সামাল দিতে থাকলাম।

এই সবকিছুর মাঝেও আমরা যেন এক অদৃশ্য সেতু বেঁধে ফেললাম। বুঁকির সুঁচ যেন সেই সেতুরই নির্মাণসামগ্রী হয়ে উঠল।   এই গোটা ঘটনা আমাকে শিখিয়ে দিল, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা মানসিক সংঘাত প্রকৃতপক্ষে সম্পর্কের পাথেয় নয়, বরং একধরনের অগ্নিপরীক্ষা। এখানে আমরা প্রত্যেকে দেখি কে কতটা সংবেদনশীল, কে কীভাবে স্ট্রেস ম্যানেজ করে, কে কার পাশে দাঁড়ায়। বুঁকির এই দুর্ঘটনা আমাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানবিকতাকে উসকে দিল - কর্তব্য, মমতা, ভয়, দায়িত্ব এবং প্রেমের এক অপূর্ব সমন্বয়।   সবশেষে, অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার খবর পেয়ে যখন বুকি ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগল, তখন আমাদের পরিবারের সবাই যেন একসাথে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাতের খাবার আমরা একসাথে খেলাম, দেরিতে হলেও, কিন্তু অদ্ভুত এক togetherness নিয়ে। বড় মেয়ে ফোনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, ছোট মেয়ে হাসতে শুরু করল, রেজার মুখেও ফিরে এল স্বস্তির হালকা হাসি।

জীবনে এমন অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত আসবেই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা কীভাবে সেই মুহূর্ত মোকাবেলা করি। বুঁকির এই ঘটনা আমাদের শিখিয়ে গেল -আপৎকালীন সময়ে পারিবারিক বন্ধনই সবচেয়ে বড় শক্তি। বিরক্তি বা অভিযোগের চেয়ে যদি আমরা একে অপরের প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থন দিই, তবে যে কোনো সংকটই জয় করা সম্ভব। এই পজিটিভ ম্যাসেজটাই আমি এই প্রবন্ধের মাধ্যমে শেয়ার করতে চাই: সমস্যা আসবেই, কিন্তু পরিবারের ভালোবাসা এবং একে অপরের প্রতি আস্থাই পারে যে কোনো অন্ধকার মুহূর্তে আলোর মশাল জ্বালিয়ে দিতে।   এই ঘটনা আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল – মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার দুর্বলতা মোকাবেলা করার সামর্থ্য নয়, বরং দুর্বলতাকে স্বীকার করে নিয়ে একে অপরের দুর্বলতাকে ঠেস দেবার ক্ষমতা। আমরা প্রত্যেকে নিখুঁত নই, আমাদের ধৈর্যের সীমা আছে, আমাদের বোঝাপড়ায় ফাটল আছে। কিন্তু যখন সত্যিকারের সংকট আসে, তখন সেই ফাটল দিয়েই যেন আলো প্রবেশ করে। আমরা একে অপরের অপূর্ণতা দিয়ে তৈরি করি এক সম্পূর্ণ আশ্রয়।