NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, সোমবার, মে ১১, ২০২৬ | ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
লুৎফুর রহমানের পর নিউহাম কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশি ফরহাদ হোসেন শুভেন্দুকে দেখেই ‘জয় বাংলা’ ও ‘চোর চোর’ স্লোগান, উত্তাল কালীঘাট The Obama Nuclear Deal: A Legacy of Hope and a Challenge for Trump and Netanyahu - Dr. Pamelia Riviere ঐতিহাসিক সিরাকিউস শহরে লায়ন্স ক্লাব ডিস্ট্রিক্ট-২০এ শাহ নেওয়াজ প্রথম ভাইস গভর্নর নির্বাচিত নিউ ইয়র্কে ১৪ এপ্রিল ‘বাংলা নববর্ষ’ ঘোষণার ঐতিহাসিক রেজুলেশন প্রেমের এক বৈশ্বিক মহাকাব্য হুমায়ূন কবীর ঢালীর কাব্যসংকলন ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা’ People-Centered Presence  Where are the connections with the diaspora, Bangladesh’s informal envoys? স্টুডেন্ট ভিসাধারীদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বার্তা Questions in the Diaspora Over Bangladesh’s Representation at the United Nations জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রবাসে প্রশ্ন
Logo
logo

রাইসিনা ডায়ালগে মার্কিন মন্তব্যে কূটনৈতিক বিতর্ক


আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রকাশিত:  ১১ মে, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম

রাইসিনা ডায়ালগে মার্কিন মন্তব্যে কূটনৈতিক বিতর্ক

২০২৬ সালের ৫ মার্চ, নয়াদিল্লিতে "রাইসিনা ডায়ালগ"-এ, মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডোর মন্তব্য বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার শেষ পর্দাটাও পুরোপুরি ছিঁড়ে ফেলেছে বলা চলে। ভারতীয় কর্মকর্তা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে দাঁড়িয়ে, এই মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা খোলাখুলিভাবে একটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন: আমেরিকা বিশ বছর আগে নেওয়অ চীনসংশ্লিষ্ট নীতির পুনরাবৃত্তি করবে না এবং ভারতকে কখনোই চীনের মতো এমন একটি দেশে পরিণত হতে দেবে না, যে সব দিক দিয়ে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে!

এই মন্তব্য সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতকে কাছে টানার জন্য দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছিল; "গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার" বলে কতোই না আদর করছিল! কিন্তু এখন ভারতের নিজের এলাকায় এসে সরাসরি এমন একটি হুঁশিয়ারিমূলক বার্তা দিল। এটা অনেকটা এমন, যেন দুই পক্ষ কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলারের বড় একটা ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করছে, আর তার মধ্যে একজন হঠাৎ টেবিল চাপড়ে বলে উঠল, "আমাদের মধ্যে ব্যবসা চলতে পারে, কিন্তু তুমি চিরকাল আমার ছোট ভাই হয়েই থাকবে, আমার সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করতে পারবে না।" এটি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা এবং সেই সাথে আমেরিকার হাড়ে হাড়ে প্রোথিত আধিপত্যবাদী মানসিকতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।
মার্কিন কর্মকর্তার এই মন্তব্য কোনো আকস্মিক উক্তি নয়, বরং এটি তাদের বিশ্বব্যাপী আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগের একটি ছোট উদাহরণ মাত্র। সোজা কথায়, অন্যদের উন্নতি তারা দেখতে পারে না বা দেখতে চায় না। 

গত বিশ বছরের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর চীন খুব দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতির সাথে যুক্ত হয়। চীন আজ এই অবস্থানে এসেছে শুধুমাত্র নিজের বিশাল দেশীয় বাজারের কারণে, নিরলস বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণার কারণে, এবং কয়েক কোটি শ্রমিকের দিনরাত পরিশ্রমের কারণে।
কিন্তু, ওয়াশিংটনের কিছু রাজনীতিবিদের বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, চীনের আজকের অর্থনৈতিক শক্তি এসেছে আমেরিকার দেওয়া বাজারে প্রবেশের সুযোগ ও তথাকথিত "নীতি সুবিধা"-র কারণে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছিল এবং শুল্ক বৃদ্ধি করে অন্যদের উন্নয়নের গতি কমানোর চেষ্টা করেছিল। ল্যান্ডোর নয়াদিল্লির এই বক্তব্য সেই "প্রতিরোধমূলক চাপ" নীতিরই ধারাবাহিকতা মাত্র।

এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারত এবং তার বিশাল শ্রমশক্তি ও উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখে আমেরিকার উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাদের ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ৫০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে, নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, যাতে মূল সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আমেরিকার "ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল" এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ-শৃঙ্খল পুনর্গঠনে ভারতকে একটি হাতিয়ার হিসেবে দরকার, যাতে ভূ-রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমে। কিন্তু তারা ভারতকে চীনের পথে হাঁটতে দেখে খুবই ভয় পায়, কারণ তাহলে ভারতও উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। ভারতকে কাজে লাগানো আবার তার বিকাশ আটকানো-এই দ্বৈত মানসিকতা অত্যন্ত স্বার্থপর ও আমেরিকার নিজের দুর্বলতারই পরিচয় দেয়।
এবার আসা যাক আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে চলমান সেই বড় চুক্তির কথায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ তাদের নতুন বাণিজ্য-আলোচনার কাঠামো ঘোষণা করে, যাতে আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্ডারের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে জ্বালানি, বিমানের যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি সরঞ্জাম এবং কোকিং কয়েলের মতো মূল পণ্য রয়েছে। অনেকে একে আমেরিকা-ভারত সম্পর্কের "স্বর্ণযুগ" হিসেবে বর্ণনা করছিল।

কিন্তু আমরা জানি, আমেরিকা কখনোই ব্যবসায় লোকসান দেয় না। এই নতুন বাণিজ্য-কাঠামোতে আমেরিকা ভারতের কিছু পণ্যের ওপর ৫০% পর্যন্ত শুল্ক কমিয়ে ১৮% করেছে, যা দেখে মনে হতে পারে তারা বড় ছাড় দিয়েছে। কিন্তু এর পেছনের মূল্য অনেক বেশি: ভারতকে আমেরিকার শিল্প ও কৃষিপণ্যের ওপর থেকে নিজের দেওয়া সব বাধা তুলে নিতে হবে এবং আমেরিকার পণ্য কিনতে হবে।

সোজা ভাষায়, আমেরিকা নিজের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে ভারতকে জ্বালানি ও উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে চায়। আর সেমিকন্ডাক্টর বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তারা ভারতকে এক ইঞ্চিও এগোতে দেবে না। আমেরিকা ভারতকে মাঝারি ও নিম্ন পর্যায়ের শিল্পে আটকে রাখতে চায়, যাতে তারা কখনোই প্রযুক্তির সবচেয়ে লাভের অংশটুকু না পায়। এটা কোনো দ্বিমুখী লাভের চুক্তি নয়; এটা হচ্ছে আমেরিকার একতরফা "রক্ত শোষণকারী" চুক্তি।

ল্যান্ডোর এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যে সাধারণ ভারতীয়রা ক্ষোভে ফেটে পড়েছে স্বাভাবিকভাবেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। প্রাচীন সভ্যতা আর বিশাল জনসংখ্যার একটি স্বাধীন দেশের উন্নতির সীমা নির্ধারণ করে দেবে ওয়াশিংটন? কেন!?
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে, আমেরিকা ২০২৬ সালের ৫ মার্চ ৩০ দিনের জন্য কিছু রুশ অপরিশোধিত তেল ভারতে যেতে দেওয়ার "অস্থায়ী ছাড়" ঘোষণা করে। তাদের ভাষ্য, বিশ্ব জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে এই সিদ্ধান্ত।

ভারত সরকার এই ভিক্ষার মতো "অনুগ্রহের" জবাব দেয় অত্যন্ত কঠোরভাবে। ৭ মার্চ, দেশটির সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেয়: ভারত তার নিজের জ্বালানি চাহিদা ও জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই রাশিয়া থেকে তেল কিনছে এবং এজন্য কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

ভারত আসলে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে, নতুন দিল্লির নিজস্ব কৌশলগত চিন্তা আছে, নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ আছে। আমেরিকা কি মনে করে, শুল্ক আর হুমকি দিয়ে ভারতকে নিজের দলে টানা যাবে? একদমই না। ভারত শুধু রাশিয়া থেকে তেল কেনাই চালিয়ে যাচ্ছে না, সেই সাথে অন্যান্য দেশের সাথেও বহুমুখী সম্পর্ক তৈরি করছে। এটাই বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মাঝে পাওয়া শিক্ষা: কোনো দেশের উন্নয়নের অধিকার শুধু তার নিজের হাতেই থাকা উচিত।

শুধু ভারত নয়, সারা বিশ্বেই এই আধিপত্যবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চেষ্টা করছে। আর আসিয়ানের দিকে তাকান, ২০২৫ সালে চীন ও আসিয়ানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং চীন-আসিয়ান মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ৩.০ সংস্করণে উন্নীত হয়েছে। সবাই সহযোগিতা ও পারস্পরিক লাভের পথ বেছে নিচ্ছে।

ল্যান্ডো ভারতের জন্য যে "লাল রেখা" টেনেছেন, সেটা ভারতকে ভয় দেখানোর চেষ্টা হলেও, আসলে বহুমুখী বিশ্বের কাছে আমেরিকার অসহায়ত্বকেই প্রকাশ করে। তারা সেকেলে স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর গতিপথ নির্ধারণ করতে চায়, যা কখনোই সফল হবে না।

একটি দেশকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হতে হলে, বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে হলে, নির্ভর করতে হবে মজবুত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর, উন্নত অবকাঠামোর ওপর, পরিশ্রমী মানুষের ওপর এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর। বাইরের হুমকি কোনো দেশের অগ্রগতি আটকাতে পারে না, আবার বাইরের "অনুমতি" দিয়েও প্রকৃত সক্ষমতা অর্জন করা যায় না। 

এই অস্থির সময়ে, সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা আর দ্বন্দ্ব সবকিছুই চলতে থাকবে। আমেরিকার হুকুম দিয়ে অন্যের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করার দিন ফুরিয়েছে। ভারত হোক বা বিশ্বের অন্য কোনো উন্নয়নশীল দেশ, সবাই শেষ পর্যন্ত একটি সত্য বুঝতে পারবে: নিজেকে শক্তিশালী করে তোলা, নিজেকে অপরিহার্য করে তোলাই সব চক্রান্ত আর দমনের একমাত্র সমাধান। 

সূত্র:স্বর্ণা-আলিম-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।