NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, সোমবার, মে ১১, ২০২৬ | ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
লুৎফুর রহমানের পর নিউহাম কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশি ফরহাদ হোসেন শুভেন্দুকে দেখেই ‘জয় বাংলা’ ও ‘চোর চোর’ স্লোগান, উত্তাল কালীঘাট The Obama Nuclear Deal: A Legacy of Hope and a Challenge for Trump and Netanyahu - Dr. Pamelia Riviere ঐতিহাসিক সিরাকিউস শহরে লায়ন্স ক্লাব ডিস্ট্রিক্ট-২০এ শাহ নেওয়াজ প্রথম ভাইস গভর্নর নির্বাচিত নিউ ইয়র্কে ১৪ এপ্রিল ‘বাংলা নববর্ষ’ ঘোষণার ঐতিহাসিক রেজুলেশন প্রেমের এক বৈশ্বিক মহাকাব্য হুমায়ূন কবীর ঢালীর কাব্যসংকলন ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা’ People-Centered Presence  Where are the connections with the diaspora, Bangladesh’s informal envoys? স্টুডেন্ট ভিসাধারীদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বার্তা Questions in the Diaspora Over Bangladesh’s Representation at the United Nations জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রবাসে প্রশ্ন
Logo
logo

শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ : একটি আলোকবর্তিকা -  ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ


আকবর হায়দার কিরণ   প্রকাশিত:  ১১ মে, ২০২৬, ১১:৪৩ এএম

শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ : একটি আলোকবর্তিকা -  ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ

  শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে অথবা ৯ এপ্রিলে এখনো সিলেট শহরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের এক মহান সৈনিক শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ এবং তার সাথীদের সমাধিতে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যান। বাংলাদেশের ইতিহাস অনেক গর্বের ইতিহাস এবং অনেক দুঃখের ইতিহাস। বাবার কথা মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছা করে যখন দেখি আমাদের প্রজন্মরা খুঁজে বেড়ায় নিজেদের অস্তিত্বকে, মূল্যবোধকে, নিজেদের মহান এবং অনুকরণ করার মতো গর্বিত হবার ইতিহাসকে। বলতে ইচ্ছে করে তার আত্মত্যাগ অকস্মাৎ কোনো ঘটনা ছিল না। তার সমস্ত জীবন, প্রতিটি পদে পদে তিনি অবলীলায় মানুষের সেবার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কোনোদিন কোনো প্রতিদান বা স্বীকৃতি চাননি। তিনি বলতেন মানুষের জন্য কাজ করতে পারাটাই সৃষ্টিকর্তার একটি আশীর্বাদ।  (শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ)  সারা জীবন ডাঃ শামসুদ্দিন ছিলেন একজন নির্ভীক এবং নিঃস্বার্থ কর্মী। ছোটবেলা থেকেই ব্রিটিশ ভারতে স্কুল জীবনে বয় স্কাউট থেকে সমাজসেবা শুরু করে, ব্রিটিশ আমলে আসামের প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া, বন্যা, বার্মা থেকে আসা উদ্বাস্তু শিবির, হজ ক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবী, কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ঠেকাতে আত্মনিয়োগ—সবই ছিল তার অসংখ্য কাজের কিছু উদাহরণ। কলকাতা মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এবং দ্বিখণ্ডিত ভারতে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান গড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে সিলেটের ভারতের অংশের করিমগঞ্জ থেকে পাকিস্তানে চলে আসেন। ঢাকাতে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে কর্মরত থাকেন। ঢাকাতে থাকার সময় তিনি-ই প্রথম পূর্ব পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সচিব হয়ে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যান। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মেডিকেল সাহায্য সংস্থা "পাকিস্তান অ্যাম্বুলেন্স কোরের" তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ১৯৫৪ সালে দেশব্যাপী বন্যায় সরকার তার উপর পুরো দায়িত্ব প্রদান করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে ছাত্র এবং ডাক্তাররা তার নেতৃত্বে দেশব্যাপী এক অভাবনীয় মেডিকেল রিলিফ কার্য পরিচালনা করেন। তার অসীম দেশপ্রেম ও কর্মদক্ষতা পাকিস্তান সরকার তাকে সুনজরে দেখেনি, তাই তার পর থেকে তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হতো এবং ১৯৫৮-এ লন্ডনে গিয়ে সার্জারিতে এফআরসিএস ডিগ্রি নিতে অনেক বাধার সৃষ্টি করেছিল। সেই সময় থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পাঞ্জাবিরা বাঙালিদের কোনোদিন ভালো চোখে দেখবে না। ১৯৬২ সালে লন্ডন থেকে ফিরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। চাকরিজীবনে কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম—যখন যেখানে গিয়েছেন সেখানে নিজের করে গড়ে তুলেছেন তার কর্মপরিধি, যা শুধু হাসপাতাল নয়, মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনসহ মানুষের সেবার জন্য গড়ে তুলতেন সব ধরনের সামাজিক প্রতিষ্ঠান।  তার সাহস ছিল অপরিসীম। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক ডাঃ শামসুজ্জোহাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি এবং বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। তখন মার্শাল ল’ এবং পাকিস্তানি কর্নেলের চোখ রাঙানি এবং প্রতিবাদ সত্ত্বেও ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ পোস্টমর্টেমের পূর্ণ রিপোর্ট পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করেন এবং তারই সভাপতিত্বে এই হত্যার প্রতিবাদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। তার এই প্রেস রিপোর্টে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলনে প্রচণ্ড শক্তি সঞ্চার হয়, এবং কিছুদিন পরে আইয়ুব খান সরকারের পতন হয়। তবে পাঞ্জাবিদের বাঙালি-ঘৃণার মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। অনেকের ধারণা সেই সময় থেকেই তিনি পাকিস্তানি মিলিটারির মৃত্যু তালিকাতে অন্তর্ভুক্ত হন।   (শেষ পারিবারিক ছবি  )  সেই সময় সিলেটে সেই উত্তাল আন্দোলনে আমি এমসি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ও ঝাঁপিয়ে পড়ি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাড়িতে একপর্যায়ে কালো পতাকা তুলে ধরি এবং আমার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। আমাকে বলা হয় তোমার বাবার সরকারি চাকরি চলে যাবে। সেই ভয়ে বন্ধুর পরামর্শে আমি স্থানীয় গোয়েন্দা বিভাগের কথায় আন্দোলনে আর যাব না বলে সাদা কাগজে সই করার জন্য প্রস্তুত হই। সেইদিন রাতে বাবা আমাকে ডাকলেন। বাবা ছিলেন খুব গুরুগম্ভীর এবং কম কথা বলতেন।

তার ধীর কণ্ঠে বললেন, তুমি যদি এটাকে সঠিক আন্দোলন মনে কর তবে তোমার বাবার চাকরির জন্য তোমার ভয় নেই, ডাক্তাররা প্রাইভেট প্র্যাকটিসও করে খেতে পারে। তবে তুমি যদি তোমার আন্দোলনের পরিণতির জন্য ভয় পাও তবে আন্দোলনে যাবার দরকার নেই। শুধু অ্যাডভেঞ্চার করার জন্য যেও না। তুমি ভয়ে পালিয়ে এলে আরেকটি সত্যিকারের উদ্বুদ্ধ ছেলে তোমার প্ররোচনায় গুলি খাবে। কিছুক্ষণের জন্য বুঝতে চেষ্টা করলাম। তারপর আমি হুলিয়া মাথায় নিয়ে মহা উৎসাহে আবার আন্দোলনে ফিরে গেলাম। তার কথার ইঙ্গিত আমাকে সারা জীবন অনুপ্রাণিত করেছে। বাবাকে খুব কাছে থেকে বেশিদিন পাইনি। আমার উঠতি বয়সে বাবার সরকারি চাকরির জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক হিসেবে থাকা এবং আমার মা সিলেট মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ থাকার জন্য আমাদের বেশির ভাগ সময়ে সিলেটে থাকতে হয়েছে। তবে তার সমাজসেবা এবং প্রতিটি কাজ খুবই গভীরভাবে পরিলক্ষিত করতাম।  ১৯৭০ সালে তিনি সিলেট মেডিকেল কলেজে সার্জারির প্রধান হয়ে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম থেকেই তিনি আসন্ন পাকিস্তানীদের হত্যাযজ্ঞের আশঙ্কায় ইমার্জেন্সি টিম এবং রক্তের ব্যাঙ্ক তৈরি করেছিলেন। ২৩ বছরের পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ আর ব্যবহারে তখন বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আশা ভঙ্গ হয়ে ধারণা সুস্পষ্ট হয়ে ছিল।

তাই তিনি এক আসন্ন বিপদ নিয়ে সবাইকে বারবার সচেতন করতে চাইলেন। অনেকেই তখন তার এই উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা বুঝতে পারেনি। ২৫ মার্চে অতর্কিতে হত্যা যজ্ঞ শুরু করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। বিমূঢ় হয়ে যায় দেশবাসী। বাবা বললেন, নির্বাচনে জেতার পরে এইরকম নৃশংসতা মানে হচ্ছে বাঙালির মেরুদণ্ড এবার ভাঙবে তারা। ব্যস্ত থাকলেন হাসপাতালে দিন-রাত অসংখ্য গুলিবিদ্ধ মানুষের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য।  সম্ভবত মার্চের ৩১ তারিখ সিলেট ক্যান্টনমেন্টের পাকিস্তানিরা তাদের দুইজন বাঙালি অফিসারকে গুলি করে হাসপাতালে ফেলে যায়। একজন ক্যাপ্টেন মাহবুব, তাকে চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলেন না, তবে লেফটেন্যান্ট ডাঃ সৈয়দ মাইনুদ্দিন বেঁচে যান। সেই দিন আমি প্রথম বর্ষ মেডিকেলের ছাত্র এবং আমার এমসি কলেজের ছাত্র বন্ধু সালাম (কর্নেল (অব:) বীর প্রতীক) ঠিক করলাম আর বসে থাকা যাবে না। তখনও কে কোথায় যুদ্ধে হচ্ছে বা হচ্ছেনা জানিনা। ঠিক করলাম বিয়ানীবাজারে পুলিশ তখন অস্ত্র জমা দেয়নি। তাদের অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলব। বিয়ানীবাজারে গিয়ে দেখি কর্নেল (অবঃ) আব্দুর রব, যিনি তখন একজন এমপি।

তিনি আমাদের তৎক্ষণাৎ তেলিয়াপাড়া গিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিতে আদেশ করলেন। আমরা তখন করিমগঞ্জ হয়ে আগরতলা দিয়ে আবার বর্ডার ঢুকে তেলিয়াপাড়া চা বাগানে পৌঁছালাম। যেহেতু আমরা আগে থেকেই রাইফেলে পারদর্শী ছিলাম, তাই শুধু গ্রেনেড এবং সাবমেশিনগান চালনা শিখিয়ে আমাদেরকে মাধবপুর এলাকায় তিন নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন নাসিমের সাথে এবং পরে লেফটেন্যান্ট হেলাল মুর্শেদের ফাইটিং প্লাটুনের সাথে সম্মুখ সমরে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সিলেটে কি হয়েছে তখনও আমরা জানিনা।  এদিকে এপ্রিলের তিন তারিখে সিলেটে যখন সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনানীরা ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে সিলেট আক্রমণ করে, তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা সিলেট থেকে সালুটিকর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান নেয়।  এই ভয়াবহ যুদ্ধে যখন হাসপাতালে যুদ্ধাহত সংখ্যা যতই বাড়তে থাকে, ততই শহরের মানুষ সিলেট ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে যেতে থাকেন। প্রায় জনশূন্য এবং ডাক্তারবিহীন হাসপাতালে আগলে রাখলেন মেডিকেল কলেজের সবচেয়ে প্রবীণ অধ্যাপক, সার্জারির প্রধান ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ। তরুণ ইন্টার্ন ডাঃ শ্যামল কান্তি লালা তার অধ্যাপককে ছেড়ে গেলেন না। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে এক কাপড়েই অনেক রোগী, মেয়ে নার্স, রোগীর স্বজনদেরকে হাসপাতাল ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সাবেক বিচারপতি সিনহা বললেন, তার চাচার গলব্লাডার অপারেশন করার পর দিন হাসপাতাল থেকে সরে যেতে বললেন, অন্য কোথাও অপারেশনের সুতাটা কেটে নিতে হবে। সিলেটের এক সময়ের মহিলা এমপি জেবুন্নেসা হকের সন্তান হয়েছে, তাকেও সরিয়ে দিলেন। নিজের পরিবারকেও আগেই গ্রামে পাঠিয়েছিলেন, তবে স্ত্রীকে বাড়িতে থেকে যেতে বললেন, কারণ নার্সরা চলে গেলে তাকে কাজে লাগাতে হবে। বিপদ বুঝেও অনড় রইলেন, যুদ্ধাহত মানুষ ভর্তি হাসপাতাল আগলে ধরে। সারা জীবনের পেশাগত দায়িত্ব আর মানবিক মূল্যবোধ তার কাছে আজ এক চ্যালেঞ্জ, কিন্তু প্রাণভয় তুচ্ছ করে তিনি অনায়াসে বেছে নিয়েছিলেন তার মহান কর্তব্যকে।  (লেফটেনেন্ট কর্নেল ডঃ জিয়াউর রহমান )  আগরতলা ষড়যন্ত্রের আসামি ক্যাপ্টেন (অব) মুত্তালিব (তার বইতে লেখা) মাত্র কয়েকদিন আগে, ২৩ ডিসেম্বর, দ্রুত মোটরসাইকেলে এসে তাকে পাকিস্তানিদের করা একটি হত্যার লিস্ট দেখালেন।

তৎকালীন খাদিমনগরের ইপিআর ক্যাম্পের একজন বাঙালি সুবেদার লুকিয়ে তাকে দিয়ে গেছে। লিস্টে ডাঃ শামসুদ্দিনের নাম উপরে জ্বলজ্বল করছে। মুত্তালিব লিখলেন, আমার চলে যাওয়ার দিকে তিনি এক নজরে তাকিয়ে ছিলেন। তাছাড়া পাকিস্তানিদের গুলিতে আহত লেফটেন্যান্ট ডাঃ সৈয়দ মাইনুদ্দিন আহমেদকে চিকিৎসা দিয়ে ৫ এপ্রিল তাড়াতাড়ি করে তাকে গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন। ডাঃ মাইনুদ্দিন এখনো বলেন, আমি কত বোঝালাম যে আপনি যুদ্ধের মাঝখানে আর এখন থাকবেন না। আমি তাদের ডাক্তার ছিলাম; তারা যদি আমাকে এইভাবে পশুর মতো গুলি করতে পারে, তাহলে তারা আপনাকে কোনোদিন ছাড়বে না।  ডাঃ শামসুদ্দিন চুপ করে থেকে বলেছিলেন, আমাকে হাসপাতালে থাকতে হবে, তুমি গিয়ে তোমার কাজে যোগ দাও। বিপদের আশঙ্কা জেনেও প্রিয়জন আর হিতৈষীদের একে একে বোঝালেন। তার চাচাকে বললেন, চিন্তা করবেন না, হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার-নার্সদের হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে। স্ত্রীকে বোঝালেন, তোমার ছেলেও তো যুদ্ধাহত হয়ে হঠাৎ আসতে পারে।  

তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত জুনিয়র ডাক্তার ডাঃ শ্যামল কান্তি লালা, এম্বুলেন্স ড্রাইভার কোরবান আলী, পুরুষ নার্স মাহমুদুর রহমান তার সাথে থেকে গেলেন। ৯ এপ্রিলে বিপ্লবীরা ভয়ানক যুদ্ধে শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য হল এবং সেই সময় হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যরা হাসপাতালে ঢুকে আহতদের সেবায় কর্মরত অধ্যাপক ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ, ডাঃ শ্যামল কান্তি লালা, এম্বুলেন্স ড্রাইভার আলী, পুরুষ নার্স মাহমুদুর রহমানসহ আরো কিছু রোগী ও তাদের পরিজনকে হাসপাতালের ভিতর হত্যা করে। তিনদিন পর তিন ঘণ্টার জন্য কার্ফু ভাঙলে তার চাচা, তৎকালীন এইডেড ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মৌলভী মঈনুদ্দিন হোসাইন, তাকে এবং অন্যান্যদের হাসপাতালের ভিতর রাস্তার পাশে মহিলা কলেজের দারোয়ান তৈয়ব আলী ও স্বল্প কিছু মানুষকে নিয়ে কবরস্থ করেন।  আমি তখন মনতলা এলাকায় যুদ্ধরত। বন্ধু সালামসহ সেক্টর কমান্ডার মেজর শফিউল্লা সবাই জানেন আমার বাবার কথা, কিন্তু তারা আমাকে জানায়নি। যুদ্ধের অনিশ্চয়তায় সবাই দিশেহারা। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই তখন একমাত্র লক্ষ্য।

কয়েক মাস পরে একদিন আমি একটি অপারেশনের পর ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত কেম্পে ফিরে এসেছি বিকালে ভাত খাবার জন্য। দেখি একজন যুদ্ধাহত, পায়ে প্লাস্টার বাঁধা সৈনিক ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমাকে গভীর কণ্ঠে বললো, আপনার বাবা বড় ভালো মানুষ ছিলেন, আমাদের বড় গৌরব। আজকে উনার জন্য আমি এখনো জীবিত। আল্লাহ উনাকে শাহাদাতের দরজা করুন। আমি যেন বজ্রাহত, মাথা ঘুরতে লাগলো, মা, ভাই-বোন কে কোথায় আছে, কীভাবে আছে। হঠাৎ পিঠে হাত রাখলো কে, দেখলাম সালামের চোখে জল। বুঝতে চেষ্টা করলাম আমরা কোথায় আছি। একটা মহাশূন্যতা গ্রাস করার চেষ্টা করলো। আবার বাবার মুখটি মনে পড়লো। বাবা বলতেন, তুমি যে দেশে জন্মেছ, যে পরিবারে থেকে পড়াশোনা করে বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছো, তা থেকে তোমার উপর একটি বড় দায়িত্ব এসে গিয়েছে। শুধু ডাক্তারি করলে চলবে না, সমাজের যেভাবে যখন প্রয়োজন হবে তোমাকে সবার আগে ছুটে যেতে হবে। প্রতিদান আশা করবে না, কারণ এটি তোমার দায়িত্ব।  আমি সেক্টর কমান্ডার মেজর শফিউল্লাহকে বললাম, আমাকে সিলেট যেতে হবে। নিজের জীবন বাজি রেখে সবার আগেই স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে এসেছি এবং সেই একই দায়িত্ববোধ থেকে যতই মহা বিপদ আসুক, আমার নিজ পরিবারের কী হয়েছে বা তাদেরকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব আমার। মেজর শফিউল্লাহ চুপ করে থেকে বললেন, এখন শহরে ঢোকা বড় বেশি বিপদ। চারদিকে পাকিস্তানিদের ঘাঁটি। তবু তুমি যদি যাও আর পরিবারের সবাইকে নিয়ে যদি ভারতে ফিরে আসতে পার, তবে আমি তাদের থাকার সব ব্যবস্থা করে দেব।  সালাম বললো, আমিও তোর সাথে যাব। আমি একটি গ্রেনেড বেল্টে নিয়ে আর সালাম একটি পিস্তল লুকিয়ে নিয়ে দুর্গম পথে কালোবাজারি নৌকার পাটাতনের নিচে শুয়ে সিলেটের দিকে রওয়ানা হলাম।

 অনেক কথা মনে পড়তে থাকে। বাবার মুখটি মনে পড়লো। বাবা বলতেন, তুমি যে দেশে জন্মেছ, যে পরিবারে থেকে পড়াশোনা করে বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছো, তা থেকে তোমার উপর একটি বড় দায়িত্ব এসে গিয়েছে। শুধু ডাক্তারি করলে চলবে না, সমাজের যেভাবে যখন প্রয়োজন হবে তোমাকে সবার আগে ছুটে যেতে হবে। প্রতিদান আশা করবে না, কারণ এটি তোমার দায়িত্ব। আর সৃষ্টিকর্তার দয়া করে দেওয়া বিদ্যা-বুদ্ধি অপব্যবহার করবে না।  আজ মনে পড়ে বাবার সম্পর্কে বহু বছর কোনোদিনই ভালো করে নিজের লেখা হয়নি। লক্ষ লক্ষ শহীদের আত্মদানে জন্ম হয়েছে বাংলাদেশ। তাদের সবার ইতিহাস লিখা না হলে কেমন যেন একটু অবিচার হয়। কিন্তু এমন একজন মানুষের আজীবন দেশ এবং মানুষের জন্য নিখাদ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা না জানালে জাতির কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।  তাছাড়া তার এই আত্মত্যাগের সঙ্গে জুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসক ও সেবা কর্মীদের মহান সাহসিকতার কাহিনী। ৯ ই এপ্রিলে তাদের হত্যা করার কিছুদিন পরে হাসপাতালে ফিরে আসেন অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডাঃ জিয়াউর রহমান, যিনি অধ্যাপক শামসুদ্দিনের এক সময়ের ছাত্র ছিলেন। একজন অত্যন্ত সাহসী বাঙালি তিনি; পাকিস্তানি কর্নেল সরফরাজ মালিকের এই হত্যার জন্য তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। বলেছিলেন, “আমার ছেলেরা এর বদলা নেবে।”

কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে ধরে নিয়ে যায়, আর ফিরে আসেননি এই সাহসী অধ্যক্ষ।  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সিলেট মেডিকেল কলেজের যে বীরত্বগাথা অবদান রেখেছে তা চিকিৎসাসেবা ও পেশাগত মূল্যবোধকে সর্বোচ্চভাবে গর্বিত ও সমুন্নত রেখেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে সিলেট মেডিকেল কলেজের এই ইতিহাস লিখার প্রয়োজন আছে। আর কতদিন এটি অবহেলিত থাকবে? এর জন্য দায়িত্ব কাদের?  তবে ডাঃ শামসুদ্দিনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতার পদক প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একবার ঢাকার জালালাবাদ এসোসিয়েশন এই উদ্যোগ নিয়েছিল, যদিও পরিবার এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল না। সেবার পদক দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন সিলেটের মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত; কিন্তু কিসের ভয়ে বা তার ছোট মানসিকতার কারণে তা হয়নি, জানা নেই। যে কোনো কারণে তা হয়নি, এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। তার দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ একটি পদকের সীমাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাছাড়া বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে সিলেটের মানুষের স্মৃতিসৌধে সম্মান, মেডিকেল ছাত্রবাস ও হাসপাতালের নামকরণ—এইসব স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি গভীরভাবে প্রতিফলিত হয় তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাঞ্জলিতে।  শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন যেখানে চিরনিদ্রায় আজ শায়িত, সেখানে গড়ে উঠেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ। পাশে গড়ে উঠেছে শহীদ মিনার।

তবে এই জায়গায় কবরগুলি বহু বছর বেড়া দিয়ে রাখা অবস্থায় অবহেলিত ছিল। তাই পরিবারের অর্থায়নে কর্নেল (অব.) আব্দুস সালামের তত্ত্বাবধানে অনেক বছর আগে তৈরি হয়েছিল এই নান্দনিক বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। কয়েক বছর আগে সিলেটের মেয়র আরিফুল যোগাযোগ করেছিলেন শহীদ মিনারের সঙ্গে, এবং বুদ্ধিজীবী কবরগুলির সংস্কারের জন্য। কথা হয়েছিল তার সঙ্গে। পরিকল্পনা ছিল এর পাশের এবং পিছনের দেয়ালে লেখা থাকবে সিলেটের ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের সিলেটের গর্বিত ইতিহাস। কিন্তু কিছুই হয়নি। তবে মনে হল বহু টাকা অপচয় করে দায়সারা গোছের একটি কাজ সারলেন তার কমিটি। আর দুঃখজনক হলো তারা পরিবারের নামফলক তুলে দিয়ে, মেয়রসহ ১৫ জন জেলা কমিশনারের নাম দিয়ে একটি বোর্ড লাগিয়ে দিলেন। এই অনিয়মগুলির জবাব দিই না করলে সিলেটের মানুষের অসম্মান করা হবে।   (শ্যামল কান্তি লালা )  আজ রাস্তার পাশে এই স্মৃতিসৌধ সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয় পথচারীদের। স্বাধীনতার সম্পূর্ণ ইতিহাস না জানার কারণে শুধু বাংলাদেশের খণ্ডিত ইতিহাস আজ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে। শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন ও তার সহযোদ্ধাদের ইতিহাস সর্বস্থরের মানুষ ও প্রজন্মকে এই অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ আরও স্মরণ করিয়ে দেবে। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তের অজানা ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেবে। যারা বেঁচে আছেন, যারা স্বাধীন দেশে মাথা উঁচু করে চলার অধিকার পেয়েছেন, তাদের কাছে এই ঋণের অঙ্গীকার হবে শুধু একটুখানি নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম এবং মানুষের জন্য ভালোবাসা।