নিউইয়র্কে বাংলা বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার আয়োজন নয়। এটি প্রবাসী বাঙালির ভাষা, স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং সাংস্কৃতিক টিকে থাকার এক দীর্ঘ নাগরিক অনুশীলন। বিশ্বের সবচেয়ে বহুভাষিক, বহুজাতিক নগরীগুলোর একটিতে বাংলা বইকে কেন্দ্র করে চার দিনের যে মিলনমেলা তৈরি হয়, তা প্রবাসজীবনের এক গভীর বাস্তবতাকে সামনে আনে: মানুষ দেশ ছাড়তে পারে, কিন্তু ভাষা ছাড়তে চায় না।
সম্প্রতি Coffee with Akbar Haider Kiron অনুষ্ঠানে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বজিত সাহার আলোচনায় সেই বাস্তবতাই নতুন করে উঠে এসেছে। ৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬-কে ঘিরে আয়োজনকারীদের প্রস্তুতি, প্রত্যাশা এবং সাংস্কৃতিক দায়বোধ নিয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এবারের আয়োজন শুধু আরেকটি বার্ষিক অনুষ্ঠান নয়, বরং তিন দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এক প্রবাসী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাইলফলক।মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত ৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ২২ থেকে ২৫ মে, নিউইয়র্কের কুইন্সের Jamaica Performing Arts Center-এ। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, এবারের মেলা ৩৫ বছরের মাইলফলক স্পর্শ করছে এবং এর ভাবনা বা স্লোগান, “As many books, so many lives”, বই ও জীবনের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে সামনে আনে। সূচি অনুযায়ী, ২২ মে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এবং ২৩ থেকে ২৫ মে প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত মেলা চলবে। স্থান, Jamaica Performing Arts Center, 153-10 Jamaica Avenue, Jamaica, NY 11432। প্রবাসী বাংলাদেশি ও বৃহত্তর বাঙালি সমাজের কাছে এই ভেন্যুটি গত কয়েক বছরে বইমেলার পরিচিত ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
এই বইমেলার ইতিহাস শুরু ১৯৯২ সালে। মুক্তধারা নিউইয়র্কের নিজস্ব পরিচিতি অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে উত্তর আমেরিকায় বাংলা বই, শিল্প ও সংগীতের প্রচারের উদ্দেশ্যে মুক্তধারার যাত্রা শুরু হয় এবং ১৯৯২ সাল থেকে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের জন্য International Bangla Festival and Book Fair, NY আয়োজনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত। এই ধারাবাহিকতা প্রবাসে কোনো একক সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে বিরল। কারণ প্রবাসী আয়োজন অনেক সময় ব্যক্তিনির্ভর হয়, উৎসাহের ওপর দাঁড়ায়, পরে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। নিউইয়র্কের এই বাংলা বইমেলা টিকে আছে কারণ এটি কেবল অনুষ্ঠান নয়, একটি সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোতে রূপ নিয়েছে। বিশ্বজিত সাহা Coffee with Akbar Haider Kiron-এ জানান, ৩৫তম আসরকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে কয়েকটি বিশেষ উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে নতুন লোগো উন্মোচন এবং একটি সমৃদ্ধ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনা। ওই স্মারকগ্রন্থে বইমেলার ঐতিহাসিক যাত্রা, প্রবাসে বাংলা ভাষা রক্ষার লড়াই, লেখক-পাঠক-প্রকাশকের ভূমিকা এবং নিউইয়র্কে বাঙালির সাংস্কৃতিক উপস্থিতির বিবরণ তুলে ধরা হবে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ৩৫তম আসর সামনে রেখে নতুন লোগো উন্মোচনের কথাও প্রকাশিত হয়েছে। মেলার আহ্বায়ক কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. নজরুল ইসলাম। সহযোগী আহ্বায়ক হিসেবে আছেন ড. ওবায়েদুল্লাহ মামুন এবং রাব্বানী ভূঁইয়া।
মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ সার্বিক তত্ত্বাবধানে যুক্ত রয়েছেন। আর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও হিসেবে বিশ্বজিত সাহা মেলার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, প্রকাশনা, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং সাংস্কৃতিক বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এবারের বইমেলার উদ্বোধক হিসেবে থাকবেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। ডেইলি সান জানিয়েছে, ৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২২ মে Jamaica Performing Arts Center-এ শুরু হবে এবং ইমদাদুল হক মিলন মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। একই প্রতিবেদনে মেলাটিকে উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ বাঙালি সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে অধ্যাপক ড. রওনক জাহান এবং ফরিদুর রেজা সাগরের। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকছেন ভারতের কবি সুবোধ সরকার, লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন, গবেষক দীপেন ভট্টাচার্য এবং জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক সাদাত হোসাইন। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমন্ত্রিত লেখক ও আলোচকদের তালিকায় রয়েছেন ড. আবদুন নূর, গৌতম দত্ত, কৌশিক সেন, অধ্যাপক বিরূপাক্ষ পাল, অধ্যাপক সৌরভ সিকদার, রুমা মোদক, জাফর আহমদ রাশেদ, মোকাররম হোসেন, অধ্যাপক শামীম রেজা, রুদ্র শংকর, ফারুক আহমেদ, আশিক মুস্তাফা এবং পারমিতা হিম। সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেবেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অদিতি মহসিন।
এই তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, মেলাটি শুধু বাংলাদেশের সাহিত্যিক পরিমণ্ডল নয়, বরং বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রবাসী বাংলা ভাষাভাষী সমাজকে একই মঞ্চে আনতে চায়। চার দিনব্যাপী এই আয়োজনে থাকবে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, সাহিত্য আলোচনা, কবিতা পাঠ, লেখক-পাঠক আড্ডা, শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্যবিষয়ক সেমিনার। ডেইলি সানও জানিয়েছে, মেলায় শতাধিক লেখক, গবেষক ও প্রকাশক অংশ নেবেন এবং সেমিনার, বই উন্মোচন, সাহিত্য আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মতো কর্মসূচি থাকবে। তবে এই আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত তার সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব। প্রবাসী সমাজে ভাষা প্রথমে ঘরে থাকে, পরে কমিউনিটি সেন্টারে যায়, তারপর ধীরে ধীরে স্মৃতিতে সরে যেতে পারে।
বইমেলা এই সরে যাওয়াকে ঠেকানোর এক সামাজিক পদ্ধতি। এখানে বাংলা ভাষা কেবল মায়ের ভাষা নয়, পাঠের ভাষা, চিন্তার ভাষা, বিতর্কের ভাষা এবং প্রকাশনার ভাষা হিসেবে উপস্থিত হয়। এবারের বইমেলায় বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তার দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, শামসুদ্দীন আবুল কালাম এবং মহাশ্বেতা দেবীকে বিশেষভাবে স্মরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। জন্মশতবর্ষে তাঁদের সাহিত্য, সমাজদৃষ্টি এবং মানবিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা হবে। এই স্মরণ শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নয়। বরং বাংলা সাহিত্যের ভেতরে যে প্রান্তিক মানুষের জীবন, সংগ্রাম, শ্রেণি, ভূমি, রাষ্ট্র এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আছে, সেটি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার সুযোগ।
মেলায় বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৫টি প্রকাশনা সংস্থা অংশ নেবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অনন্যা, প্রথমা প্রকাশন, সময় প্রকাশন, পাঞ্জেরী, অনিন্দ্য প্রকাশ, বাংলা প্রকাশ, কবি প্রকাশনী, বাতিঘরসহ বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বই পাঠকদের জন্য প্রদর্শিত হবে। প্রবাসে বাংলা বই পৌঁছানো সহজ নয়। মুদ্রণ, পরিবহন, আমদানি, পাঠকের রুচি এবং ভাষার পরিবর্তিত অভ্যাস, সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি কঠিন কাজ। তাই নিউইয়র্কের বইমেলা প্রবাসী পাঠকের কাছে শুধু বই এনে দেয় না, প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে পাঠকের সরাসরি সম্পর্কও তৈরি করে। তবু এই মেলার সামনে কঠিন প্রশ্নও আছে।
দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি তরুণদের সঙ্গে বাংলা বইয়ের সম্পর্ক কতটা গভীর? তারা কি বই কিনছে, নাকি শুধু অভিভাবকের সঙ্গে মেলায় আসছে? বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ কি কেবল স্মৃতিনির্ভর হবে, নাকি সৃজনশীল ও সমকালীন ভাবনার ভাষা হিসেবে নতুন পাঠক তৈরি করবে? বইমেলার ৩৫তম আসর উদযাপনের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া জরুরি। প্রবাসে বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় বিপদ নিষেধাজ্ঞা নয়, উদাসীনতা। কেউ বাংলাকে নিষিদ্ধ করছে না। কিন্তু ইংরেজির প্রাত্যহিক ক্ষমতা, ডিজিটাল মনোযোগের বিভাজন এবং ঘরে ভাষাচর্চার দুর্বলতা বাংলা পড়ার অভ্যাসকে ক্ষয় করতে পারে। তাই বইমেলার পরবর্তী দায়িত্ব শুধু বই বিক্রি নয়, পাঠক তৈরি করা। শিশুদের জন্য শক্তিশালী কর্মসূচি, তরুণদের জন্য দ্বিভাষিক সেশন, অনুবাদ উদ্যোগ, ডিজিটাল আর্কাইভ, লেখালেখি কর্মশালা এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি।
এই জায়গাতেই Coffee with Akbar Haider Kiron-এর আলোচনা তাৎপর্যপূর্ণ। আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের বাইরে এমন কথোপকথন অনেক সময় সাংস্কৃতিক উদ্যোগের অন্তর্গত শ্রম, উদ্বেগ ও আশা সামনে আনে। বিশ্বজিত সাহার কথায় বোঝা যায়, বইমেলাটি শুধু অতীতের গৌরব উদযাপন করতে চায় না, ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়েও ভাবতে চায়। নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ৩৫তম আসর তাই একটি প্রতীকী মুহূর্ত। এটি দেখাবে, প্রবাসী বাঙালি সমাজ নিজের ভাষাকে কতটা জীবন্ত রাখতে চায়। বাংলা বইমেলা যদি শুধু স্মৃতির উৎসব হয়, তবে তার প্রভাব সীমিত থাকবে। কিন্তু যদি এটি নতুন পাঠক, নতুন লেখক, নতুন অনুবাদ এবং নতুন সাংস্কৃতিক সংলাপ তৈরি করতে পারে, তবে এটি হয়ে উঠবে প্রবাসে বাংলা ভাষার এক কার্যকর ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠান।
নিউইয়র্কের মতো শহরে বাংলা বইয়ের জন্য চার দিন ধরে মানুষ জড়ো হয়, এ ঘটনাই কম নয়। কিন্তু ৩৫ বছরের পর প্রশ্ন আরও বড়: এই মেলা কি শুধু প্রবাসী বাঙালির আবেগ ধরে রাখবে, নাকি বাংলা ভাষাকে আগামী প্রজন্মের বৌদ্ধিক জীবনের অংশ করে তুলবে? উত্তরটি নির্ভর করবে বইমেলার ভিড়ের ওপর নয়, বরং মেলার পরে কতজন নতুন করে বাংলা বই হাতে নেয়, বাংলা ভাষায় ভাবতে শেখে এবং নিজের পরিচয়কে কেবল স্মৃতি নয়, সৃষ্টিশীল শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে তার ওপর। ----------------- এ এইচএম এ এএইচএম বজলুর রহমান ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, তথ্যের অখণ্ডতা ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক নীতি-পরামর্শক; বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর
